দুঃসহ হয়ে উঠেছে নগরীর যানজট। প্রায় সব ক'টি প্রধান সড়কে (কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাইপাসগুলোতেও) প্রতিদিন যানবাহনের তীব্র ভিড় শুধু নাগরিক ভোগান্তিই নয়, বাড়িয়ে দিয়েছে সময় ও শ্রমের অপব্যয়। আর তাই যানজট নিরসন করে নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের লাখ লাখ টাকার প্রতিদিনকার ক্ষতি অবিলম্বে দূর করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনের অধিক যানবাহন, অপ্রশস্ত রাস্তা, রিকশার জন্য আলাদা লেন না থাকা, ফুটপাতের দখলদারিত্ব, ড্রাইভারদের দুর্নীতি, (অলাইসেন্সকৃত যানবাহন বেআইনিভাবে রাস্তায় নামানো) সিগন্যাল অমান্য করার চিরায়ত রেওয়াজ ইত্যাদি নানা কারণকে যানজটের পিছনে দায়ী করা হলেও এখন পর্যন্ত এগুলোর নিরসনকল্পে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
আর তাই একাধিক ফ্লাইভার নির্মাণ সত্ত্বেও রাজধানীর যানজটের চিত্রটা প্রায় একই রকম রয়ে গেছে, উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। যানজট নিরসনকল্পে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো কার্যকরী হতে পারে।
এক. ফিটনেস এবং লাইসেন্সবিহীন যানবাহনগুলোর চলাচল বন্ধে মোবাইল কোর্ট এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করা (অন্তত কয়েক মাস)।
দুই. সিগন্যাল ও নির্দিষ্ট লেন অমান্যকারীদের তাৎক্ষণিক জরিমানা নির্ধারণ, লাইসেন্স বাতিল (প্রয়োজনে) এবং কারাদণ্ড প্রদান ও তা নিশ্চিতকরণ।
তিন. পথচারীদের পারাপারে ওভারব্রিজগুলোকে হকার, নেশাগ্রস্ত ও ভিক্ষুকমুক্ত করা। ওভারব্রিজ ব্যবহার না করাকে আইনের লক্সঘন হিসেবে ঘোষণা করে অমান্যকারীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ। এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক জরিমানা নির্ধারণ ও তার প্রয়োগ (কয়েক মাসব্যাপী) জনগণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করবে।
চার. অবৈধভাবে ফুটপাত দখল, রাস্তার পাশে গৃহনির্মাণসামগ্রী ফেলে রাস্তাকে অপ্রশস্ত করা এবং পর্যাপ্ত জায়গা না রেখে অপরিকল্পিত গৃহ নির্মাণের প্রচেষ্টা বন্ধে আইনের যথাযথ ও কার্যকর প্রয়োগ দরকার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন সহায়তা করতে পারে।
পাঁচ. রিকশার জন্য আলাদা লেন ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে একমুখী সড়ক স্থাপন (শুধু রিকশা ও অন্যান্য দ্বি-চক্রযানগুলো চলাচলের জন্য) এবং তার যথাযথ ব্যবহারে রিকশাচালক ও অন্যান্যদের অবহিত ও বাধ্য করা, প্রয়োজনে আইনের সাময়িক প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রেও মনিটরিং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রয়োজন।
ছয়. লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো যাতে ড্রাইভাররা ঘুষ প্রদান বা অন্য কোনো প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে ট্রাফিক পুলিশের সামনেই অনুমোদনহীনভাবে যত্রতত্র চালাতে না পারে সে ব্যাপারেও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
আইন প্রয়োগকারী সব সংস্থাকে এ ব্যাপারে সততা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। সাত. রাস্তা সংস্কারের নামে এবং উন্নয়ন কাজের নামে যত্রতত্র রাস্তা কেটে বিনা নোটিসে রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ বাড়ানোর পরোক্ষ চেষ্টা বন্ধ করা উচিত। এর ফলে রাস্তার তীব্র যানজট দূর করা যেমন সম্ভব হয় না, তেমনি জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য সমস্যা থেকেও নগরবাসীকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত মনিটরিং ও তীক্ষ্ন নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুত, আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য জনসচেতনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে বিশেষত ছোট্ট এ দেশটার রাজধানী শহরেই চলছে বিশৃক্সখল ও এলোমেলো জীবনচর্চার প্রবণতা। তাই আইন মেনে, সুশৃক্সখল নগরজীবন উপহার দেওয়ার জন্য সবার আন্তরিকতা প্রয়োজন। আর তা হলেই, নগরজীবনে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে, দরিদ্র এ দেশটার আর্থিক ক্ষতি যানজটের কারণে যাতে আর না বাড়ে সেটি নিশ্চিত হতে পারে।
রি. মু.
সিনিয়র প্রভাষক, কলেজ অব ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিড, ধানমণ্ডি, ঢাকা।














