Chittagong
May 21st, 2012
Top Gun
অংসান সু চি
November 19th, 2010175 views

অন্তরালেও তাকে ভয় পায় ক্ষমতা

সু চির মুক্তিতে জান্তার কি লাভ? সামরিক সরকারের অনুগামী দল পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভোটে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সু চিকে মুক্তি দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বৈধতা এবং সমর্থন লাভের চেষ্টা করতে পারে সরকার। নতুন বিক্ষোভের সম্ভাবনাও এড়ানো যাবে বলে ধারণা।

ইতিমধ্যে অবশ্য মিয়ানমারে একটা সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে। এনএলডি অংশ নেয়নি তাতে। ফের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করেছে জান্তাই। এখন মুক্ত সু চি কি গণতন্ত্র ফেরাতে পারবেন কি? তাকে রাজনীতিতে অংশ নিতে দেয়া হবে? নাকি থেকে যেতে হবে অন্তরালেই?

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রণীর ভূমিকায় ছিলেন তার বাবা। গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াইয়ে মেয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেটা তার নিজের কথায়, 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম'।

১৯৮৮ থেকে লড়াই শুরু। সে লড়াই আজো চলছে। ১৯৮৯-এ প্রথম কারাবরণ। তারপর থেকে ২১ বছরের মধ্যে ১৫ বছরই কেটে গেছে গৃহবন্দি হয়ে। তিনি অং সান সু চি। গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের মুখ তিনি।

সু চির বাবা জেনারেল অং সান ছিলেন সাবেক বর্মা, অধুনা মিয়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক। সু চির জন্ম ১৯৪৫ সালে। এর দু'বছর পর আততায়ীর হাতে প্রাণ যায় অং সানের। সু চি আর তার দুই ভাইকে একাই মানুষ করেন তাদের মা, খিন চি। খিন চি নিজেও মিয়ানমারের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ষাটের দশকের গোড়ায় ভারত ও নেপালে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। মায়ের সঙ্গেই ভারতে পড়তে এসেছিলেন সু চি। দিলিস্নর লেডি শ্রীরাম কলেজে তার বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান। তারপর সোজা অক্সফোর্ডে পাড়ি। রাজনীতি, দর্শন আর অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা। ১৯৭২ সালে বিয়ে করেন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ মাইকেল অ্যারিসকে।

১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সু চি-র জীবন নির্ঝঞ্ঝাটেই কেটেছিল। দুই ছেলের মা। নিজে গবেষণার কাজ করেছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাধিক পদের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। চাকরি সূত্রে তাকে ফের ভারতেও আসতে হয়েছিল কিছুদিন। মৃতু্যপথযাত্রী মাকে দেখতে ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরলেন। আর তার জীবনের মোড়ও চিরদিনের মতো ঘুরে গেল। ঐ বছরই পদ ছাড়লেন সমাজতন্ত্রী শাসক নে উইন। মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থিদের আন্দোলনও জোরদার হয়ে উঠল। সু চি সেই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন।

৮ আগষ্ট, ১৯৮৮ অর্থাৎ ৮৮৮৮। দিনটি 'শুভ' মনে করা হয় মিয়ানমারে। গণতন্ত্রের জন্য বিক্ষোভ সবলে দমন করা হল। পরের মাসেই ক্ষমতায় এল নতুন সামরিক 'জান্তা' সরকার। সু চি গড়ে তুললেন তার নতুন দল, 'ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি' (এনএলডি)। ১৯৮৯ সালে গৃহবন্দি করা হল তাকে। বলা হয়েছিল, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার অঙ্গীকার করলে মুক্তি মিলবে। সু চি রাজি হননি। তার বন্দিদশার সেই শুরু। কী করে সময় কাটবে? স্বামী মাইকেল বই পাঠাতেন- দর্শন, রাজনীতি আর জীবনীসাহিত্য। কখনো পুরো বন্দি, কখনো নিয়ন্ত্রিত মুক্তি, কখনো সাময়িকভাবে মুক্তি। এই ভাবেই কেটেছে পরের ২১ বছর।

১৯৯৯-এ মারা যান মাইকেল। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯- এই দশ বছরে স্বামী-স্ত্রীর দেখা হয়েছিল মাত্র পাঁচ বার। শেষ দেখা ১৯৯৫-এ। তখন একবার মুক্তি পেয়েছিলেন সু চি। তবে বলা হয়েছিল, ইয়াঙ্গুনের বাইরে যেতে পারবেন না তিনি। পরের বছর সু চির কনভয়ের ওপরে হামলা হল। ঘটনাটার একটা নামকাওয়াস্তে তদন্ত করলো জান্তা সরকার। কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি যথারীতি। স্বামীর মৃতু্যর পর তার অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দেয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন, কিন্তু সু চি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেন সেই প্রস্তাব। তার আশংকা ছিল একবার দেশ ছাড়লে আর ফিরতে দেয়া হবে না তাকে।

সু চির মুক্তিতে জান্তার কি লাভ? সামরিক সরকারের অনুগামী দল পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভোটে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সু চিকে মুক্তি দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বৈধতা এবং সমর্থন লাভের চেষ্টা করতে পারে সরকার। নতুন বিক্ষোভের সম্ভাবনাও এড়ানো যাবে বলে ধারণা।

জান্তা কি নিজের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি নিয়ে চিন্তিত?

সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রমাণিত, তারা এ নিয়ে মাথা বিশেষ ঘামান না। চীন যদি নিঃশর্তে টাকা ঢালে এবং ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য অটুট থাকে তাহলে পশ্চিমা দেশের লগি্ন প্রয়োজন না-ও হতে পারে মিয়ানমারের। গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য চাপ দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোই।

জান্তার কাছে সু চি কতটা ভয়ের কারণ?

সু চির অসম্ভব জনপ্রিয়তা সামরিক সরকারের কাছে চিন্তার। নির্বাচন শেষ হলেও সরকার গঠন হয়নি।

১৯৯০-এ মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন হয়। পার্লামেন্টে ৮০ শতাংশ আসনই পায় এনএলডি। হিসেব মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা সু চি-র। কিন্তু জান্তা ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। ভোটের ফল চুলোয় গেল। সু চি আবার বন্দি হলেন। সেই সময়েই সু চি-র বিখ্যাত বক্তৃতা, 'ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার'। তিনি বললেন, 'ক্ষমতা নিজে দূষণ ছড়ায় না। আমাদের দূষিত করে, ভয়। ক্ষমতা হারানোর ভয় দূষিত করে ক্ষমতাসীনকে, ক্ষমতার কষাঘাতের ভয় দূষিত করে ক্ষমতাধীনকে।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সু চির নাম ঘোষিত হল ১৯৯১ সালে। ২০০০ সালে আবার গৃহবন্দি করা হয় তাকে, ছাড়া পান ২০০২-এ। পরের বছর দেপাইন শহরে ফের হামলা হল তার কনভয়ে। সরকারি মতে, চার এনএলডি সমর্থক মারা যান সে দিন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে দাবি ছিল, অন্তত ৭০ জনের মৃতু্য হয়েছে। ঘটনাটি 'দেপাইন গণহত্যা' নামেই পরিচিত। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের পরবতর্ী পদক্ষেপ কি হল? আরো একবার বন্দি হলেন সু চি। তখন থেকেই বন্দিই ছিলেন তিনি। বারংবার আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে তার বন্দিত্বের মেয়াদ বাড়িয়ে গিয়েছেন জুন্টা সরকারের প্রধান থান শোয়ে। জাতিসংঘের তরফে হস্তক্ষেপ করেও কোন লাভ হয়নি।

২০০৯ থেকে অবস্থাটা একটু একটু বদলাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছিল ক্রমশ। সু চি-র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আলগা করা হচ্ছিল। দেশ-বিদেশের নেতারা এত দিনে তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেলেন। এ বছর পয়লা অক্টোবর জান্তা জানায়, ১৩ নভেম্বর মুক্তি দেয়া হতে পারে সু চি-কে। মুক্তি দেয়াও হয়েছে তাকে। ইতিমধ্যে অবশ্য মিয়ানমারে একটা সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে। এনএলডি অংশ নেয়নি তাতে। ফের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করেছে জুন্টাই। এখন মুক্ত সু চি কি গণতন্ত্র ফেরাতে পারবেন কি? তাকে রাজনীতিতে অংশ নিতে দেয়া হবে? নাকি থেকে যেতে হবে অন্তরালেই?